বাসে বসে থাকা, অজানা কাউকে সম্মান দেখানো, কিংবা কণ্ঠস্বরের ভদ্রতা – এসব শেখায় কে?
ঢাকার সকাল মানেই যুদ্ধ। গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রতিদিনের মতো আজও হাজার হাজার মানুষ নেমেছে পথে। গাবতলীর লোকাল বাসগুলো যেন এক একটা আবর্জনার গাড়ি, প্রতিটা ইঞ্চি ঠেলে ঠেলে লোক উঠায়। ঠিক এমন একটা বাসে উঠলো রাফি।
সিট না পেলে দাঁড়িয়ে যেতে হবে পুরো রাস্তায়। না, আজ সিট পেলে হাতছাড়া করা যাবে না।
বাস থামে, লোক উঠে, রাফি দৌড়ে উঠে গিয়ে এক সিটে বসে পড়ে।
পাশে বসা মধ্যবয়সী লোকটার নাম হাশেম। তাঁর গা চেপে বসে পড়ে রাফি। কনুই দিয়ে ইচ্ছা করে হালকা চাপ দিয়ে চোখ রাঙিয়ে বলে, আঙ্কেল, একটু সরে বসুন তো! এভাবে বসা যায়?
হাশেম সাহেব ধীর কণ্ঠে জবাব দেন, আমি তো সরে বসেছি ভাই, জায়গা তো বেশি নেই। তাও চেষ্টা করছি। বলে শরীরটাকে চাপিয়ে নিজ সিটের কিছু অংশ ছেড়ে দেয়ার চেষ্টা করেন হাশেম সাহেব।
রাফি মনে মনে এটাকে জয় হিসেবে গর্বিত অনুভব করে। পাশের সিটের এক আবালকে শায়েস্তা করার জয়!
কোন উত্তরই দিতে পারল না। উত্তর দিলেই কি ছেড়ে দিতাম নাকি? কিছু বললে সঙ্গে সঙ্গে বলে দিতাম— "গায়ে গা লাগলে মরবেন নাকি? আর তাছাড়া এখানে আমার সাথে তর্ক করতে আসলে দেখিয়ে দিব না। চেনে আমি কে?"
রাফি একটা কাল্পনিক চরিত্র, যার সাথে আমরা হরহামেশাই পরিচিত হই প্রতিটি পাবলিক বাসে।
না, রাফি কোনো একক ব্যক্তি নয়। আমাদের শহরের প্রতিটি লোকাল বাসে, লঞ্চে, ট্রেনে – প্রতিদিন শত শত রাফির দেখা মেলে। এরা হয়ত আলাদা চেহারার, ভিন্ন বয়সের, বা ভিন্ন পেশার, কিন্তু এদের আচরণগত ডিএনএ একই রকম।
তবে প্রশ্ন হলো এই রাফিরা কি কেবল বাংলাদেশেই আছে?
অন্যান্য দেশে কী হয়?
জার্মানিতে আপনি যদি লোকাল বাসে ওঠেন, প্রথমেই চোখে পড়বে—প্রবেশ করেই একজন অপরিচিত ব্যক্তিও "Guten Morgen" (শুভ সকাল) বলে পাশের জনকে সম্ভাষণ জানায়।
কেউ সিটে বসতে চাইলে আগে জিজ্ঞেস করে—
“Can I sit here?”
“Do you have enough space?”
আর যদি কেউ সামান্য গা লাগায়—
“I’m sorry.”
“Is that okay?”
ভদ্রতা এখানে ভান নয়, বরং সামাজিক শিক্ষা।
জাপানে বাসে চড়ার আগে মানুষ কানে হেডফোন থাকলেও শব্দ কমিয়ে ফেলে, যেন পাশের জন বিরক্ত না হয়। সিটে বসার আগে বা পরে কেউ যদি অনুভব করে অন্যের জায়গায় অসুবিধা হচ্ছে, সঙ্গে সঙ্গে ঝুঁকে যায়, মাফ চায়, মাথা নিচু করে।
সেখানে কল্পনা করুন রাফির মতো কেউ চিৎকার করে বলছে, “কি হইছে ভাই? গায়ে গা লাগলে মরবেন নাকি?” এমন ঘটনা জাপানে ঘটলে ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হয়ে সমাজব্যাপী নিন্দা শুরু হতো।
তাহলে প্রশ্ন হলো আমাদের রাফিরা এমন হলো কেন? আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা কোথায় ফেল করলো?
আমাদের স্কুলে “শিষ্টাচার” বলে যাই শেখানো হয়, তা কেবল বইয়ের পৃষ্ঠা জুড়ে। কিন্তু বাসে বসে থাকা, অজানা কাউকে সম্মান দেখানো, কিংবা কণ্ঠস্বরের ভদ্রতা – এসব শেখায় কে?
অনেক মা-বাবা নিজেরাই গর্ব করে বলেন— “আজকে বাসে একজনকে শায়েস্তা করে আসলাম!”
সন্তান দেখে, শেখে, মুগ্ধ হয়।
সমাজও প্রশংসা করে জিতে যাওয়াকে, জিতে যাওয়ার ধরনকে নয়।
আমি কি সত্যিই আমার সন্তানকে রাফি হতে দেখতে চাই? আমার সন্তান যদি জ্ঞানে বুদ্ধিতে আইনস্টাইনও হয় তবুও কি আমি তাকে আচরণে রাফি হতে দিতে পারি? উত্তর যদি "না" হয়, তবে এ থেকে আমার সন্তানকে ভালোভাবে বেড়ে তোলার উপায় কি?
উপায় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার উন্নয়ন।
আমরা কী শিখি স্কুলে? অংক, ইংরেজি, বাংলা, বিজ্ঞান—এসবই তো? কিন্তু বাসে ওঠার পর পাশের লোকটার প্রতি সৌজন্য রক্ষা করব কীভাবে, সেটা কোথায় শিখি?
শিখি না। অথচ শেখাটা জরুরি।
ধরুন, চতুর্থ শ্রেণির একটি পাঠ্যবইয়ে একটি অধ্যায় রাখা হলো: "ভদ্রতা শেখা: বাসে, বাজারে, স্কুলে"। সেখানে ছোট ছোট গল্প থাকবে। যেমন—
রাহাত বাসে উঠে দেখে সব সিট ভর্তি। এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন। সে নিজের ব্যাগটা কোলে নিয়ে জায়গা করে দিল। বৃদ্ধ হেসে বললেন, “তুমি একজন ভালোমানুষ।”
এই গল্প পড়িয়ে শিক্ষক জিজ্ঞাসা করলেন—“তোমরা হলে কী করতে?”
একজন ছাত্র হয়তো বলল, “আমি দাঁড়িয়ে জায়গা দিতাম।”
শিক্ষক বললেন—“কেন?”
সে বলল—“ওনার কষ্ট হচ্ছিল।”
শিক্ষক হালকা করে হেসে বললেন, “এটাই হলো ভদ্রতা।”
দ্বিতীয় ধাপে শিক্ষক একটা ভূমিকা ভিত্তিক খেলা করালেন।
একজন দাঁড়িয়ে থাকবে, একজন বসবে। পরিস্থিতি: বাসে ভিড়, বৃদ্ধ লোক উঠেছেন। কে কী করে?
একজন ছাত্র দাঁড়িয়ে বলল—“চাচা, আপনি বসেন।” অন্যজন বলল—“আমি আগে উঠেছি।” তখন শিক্ষক সবাইকে জিজ্ঞাসা করলেন—“তোমরা কোন আচরণকে ভালো বলবে?”
তৃতীয় ধাপে শিক্ষক ছাত্রদের বললেন—“আজ থেকে এক সপ্তাহ, তোমরা যারা বাসে উঠো বা বাজারে যাও, সবার প্রতি সৌজন্য দেখাবে। তোমাদের অভিজ্ঞতা পরের ক্লাসে শোনাবে।”
চতুর্থ ধাপে শিক্ষক খাতা খুলে বললেন—“আজ আমরা লিখব—‘আমি কীভাবে একজন সহানুভূতিশীল মানুষ হতে পারি?’”
এই হলো পাঠদান।
শুধু পড়ানো নয়—অভিনয়, আচরণ, ব্যাখ্যা, মূল্যায়ন—সব মিলিয়ে শিক্ষা। এই শিক্ষা যখন প্রথম শ্রেণি থেকেই শুরু হয়, তখন দশ বছর পর সেই শিশু একদিন গাবতলীর বাসে বসে নিজের শরীরটাকে একটু সরিয়ে নেয়। নিজের জায়গা কমিয়ে দেয়। মনে মনে ভাবে—“ভদ্রতা আমার পরিচয়।”
আর তখন আমি, যিনি শরীরটা চেপে বসি, তাকিয়ে দেখি—এই ছোট মানুষটা আমাকে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে।
এই শিক্ষাটা তখন আর পরীক্ষার খাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না। এটা রক্তে মিশে যায়। ব্যবহারে ফুটে ওঠে। কারণ তাকে এমনভাবে শেখানো হয়েছে যেন সে তা ভুলতেই না পারে।
আমরা যদি চাই আমাদের সমাজে সবাই বাসে উঠে পাশের জনকে সম্মান দেবে, তবে আমাদের স্কুলে শিক্ষকেরা প্রথমেই শেখাতে হবে—“মানুষ হও”। আর সেটা শুরু করতে হবে সেই মুহূর্ত থেকে যখন একজন শিশু ‘A for Apple’ শেখে।
শিক্ষার আসল অর্থ তখনই সফল হয়, যখন একটি শিশু শুধু পরীক্ষায় পাস করে না, বরং সে একজন ভদ্র, সহানুভূতিশীল এবং বিবেচক মানুষ হয়ে ওঠে।

Post a Comment